RNI NO. WBBEN/2007/24258

ভুলেই শেষ ফ্রান্স ১৬বছর পর ‘মিশন ফাইনালে’ স্পেন

গৌতম ঘোষ

আর্লিটনের এটি এন্ড টি স্টেডিয়ামে ডালাসের রাতটা ফ্রান্সের জন্য পেরেক হয়ে রইল। স্পেন এসেছিল ছুরি নিয়ে, ফ্রান্স এসেছিল ঢাল তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দার হয়ে। ফল? ০ তে বিধ্বস্ত হয়ে  গতবারের রানার্সদের ফাইনালের স্টেশনে পৌঁছানোর স্বপ্ন শেষ।

ম্যাচের ২২ মিনিটেই গল্প লেখা হয়ে গেল। লামিন ইযামাল ডান দিক দিয়ে ঢুকছেন, ফ্রান্সের লুকাস ডিনজের ক্লিয়ার করতে গিয়ে বুটটা সোজা ইযামালের গোড়ালিতে। পেনাল্টি। নো মিস। ওইয়ারজাবাল নিখুঁত শটে বল গোলকিপারের বাঁ দিক দিয়ে জালে জড়িয়ে দিলেন। ঝাঁপিয়েও বলের নাগাল পেলেন না ()

কিন্তু গোলের চেয়েও বড় কথা ফ্রান্সের ডিফেন্স। বক্সের মধ্যে কোনও ওয়ালই ছিল না। নিদেনপক্ষে সেনেগাল বা কাবো ভার্দে যেভাবে ৬৭ জন মিলে ব্লক করে শেষ পর্যন্ত দেখে ফাইনাল ট্যাকেলে যায়, ফ্রান্সের তা ছিল না। বল পেলেই ৮ জন ওপরে উঠে যাচ্ছে। নিচে পরে থাকছে শুধু মালিবাউপামেকানো। দুই বনাম তিন  অথবা দুই বনাম চার এই অংকে ফ্রান্স বারবার কেঁপে গেছে। ম্যাচের শেষ পর্যন্ত ওই কাঁপুনি থামেনি।

এইসব দেখে ড্রাগআউটে বসে কোচ দেশ কখনও কপালে হাত দিচ্ছিলেন, কখনও হতাশ হয়ে নিজের চেয়ার ছেড়ে সাইড লাইনে উঠে এসে হাত দেখিয়ে কিছু বলতে চাইছিলেন। বিরতিতে মনে হয়েছিল কোচের পেপটকে এক রূপান্তরিত ফ্রান্সকে দেখা যাবে। বদলে সিস্টেম ধ্বংস করে ফ্রান্সের আত্মহত্যা দেখতে হল। ৫৮ মিনিটে ম্যাচ শেষ। ওলমোপোরো ওয়ানটু পাস খেললেন। উপমেকানো স্লাইড করলেন, ফাঁকা।ফাইনালট্যাকলেরকোনওগল্পনেই।

পোরোর ডান পায়ের শট জালে জড়িয়ে গেল()

এরপর যা হল, সেটাদেখেচোখেকারনাজলআসে।

এমবাপে বোতলবন্দি। বল পেলেই সামনে তিনজন। অক্টোপাসের মত জড়িয়ে আছে। তিনি বারবার ডিপে নেমে বল নিয়ে আক্রমণ তৈরির চেষ্টা করছিলেন। আর সেখানেই বিপদ। কোনোভাবেই নিজেকে ফিরে পেলেন না। যা করলেন সবেতেই ব্যর্থ।

এরই পাশাপাশি ব্যাক পাসের আত্মঘাতী খেলা। চাপের মধ্যে ফ্রান্সের ডিফেন্স ৯ বার গোলকিপারকে ব্যাক পাস দিল। যা থেকে তিনবার প্রায় গোল খেয়ে যাচ্ছিল। আর একটা ভুল,  গোলকিপার ওই ব্যাক পাস থেকে বল পেয়ে যতবার শট নিয়েছে, সতীর্থরা পায়নি, স্পেন পেয়েছে। এভাবেই ফ্রান্স নিজেদের ফাঁদে নিজেরাই মাকড়সার জালের মতো আটকে গেছে।

অজস্র ভুল পাস তো ছিলই। ফাইনাল থার্ডে ফ্রান্সের পাসিং অ্যাকুরেসি ৬৮ শতাংশ। গ্রিজম্যান, দেম্বলে, এমবাপেদের সবার পায়ে যেন জং। স্পেন বল পেয়ে বন্দেভারতের গতিতে ফ্রান্সের বক্সে কম্পন তুলেছে। সেখানে ফ্রান্স যেন গেদে লোকাল।

স্পেনের মাস্টারপ্ল্যান কী ছিল?

এক: রদ্রিফাবিয়ান জুটি ফ্রান্সের মাঝমাঠকে কেটে দিয়ে খেলা ধরতেই দেয়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বল পেয়ে ফ্রান্স লম্বা বল খেলতে বাধ্য হয়েছে।

দুই: ৩০৯ বার হাই প্রেস। যা ফ্রান্সের যাবতীয় বিল্ড আপ ও

পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছে।

তিন: ইয়ামাল শুধু পেনাল্টি আদায় করেননি, পুরো ডান দিক দখল করে আমফান ঝড় তুলেছেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে এমন ঠান্ডা মাথা! সত্যি ভাবা যায় না।

এই ম্যাচের ময়নাতদন্তে এভাবেই ফ্রান্সের কবরে যাওয়ার অনেক কারণ উঠে এসেছে।

এক: ডিফেন্সিভ ট্রানজিশন শূন্য। কাউন্টার অ্যাটাক ঠেকাতে নামছিল ২ জন। বাকিদের উদ্দেশ্যহীনভাবে গোলের জন্য দৌড়েছে। এটা ক্লাব ফুটবল নয়,বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল।

দুই: তারকা নির্ভরতা। সিস্টেম নেই। এমবাপে আটকে গিয়ে পুরো আক্রমণ শেষ। ৮ গোল করা গোল্ডেন বুটের অন্যতম দাবিদারের গোলে শট নেওয়ার শতাংশ মাত্র ০.৩০।

তিন: মানসিকভাবে ভেঙে পড়া। ২০ হবার পর শরীরী ভাষাই বলে দিচ্ছিলহবে না

স্পেন টানা তৃতীয় গ্রীষ্মে সেমিতে ফ্রান্সকে হারাল। টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত। টুর্নামেন্টে ষষ্ঠ ক্লিনশিট।

ফ্রান্স হেরেছে কারণ তার ভেবেছিল নামেই জেতা যায়। এমবাপে, দেম্বলে, গ্রীজম্যানদের কাকে ছেড়ে কাকে আটকাবে? স্পেন জিতেছে কারণ তারা প্রমাণ করেছে দলগত সংহতিই সব।

২০১০ এর পর আবার এবারের বিশ্বকাপেরবড়দিন  ফাইনালে লা রোজা। প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা বা ইংল্যান্ড।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top